আঙ্কেল টমস কেবিন - হ্যারিয়েট বিচার স্টো



মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিঙ্কন একবার এক লেখকের সাথে দেখা হওয়ায় রহস্য করে বলেছিলেন,

“এই সেই মহিলা, যে একখানা বই লিখে দেশে গৃহযুদ্ধ বাধিয়ে দিয়েছিলেন।”

হেবার বস পদ্ধতিতে এ্যামোনিয়া তৈরিতে চাপ, তাপ এবং আয়রন যেমন প্রভাবক হিসেবে কাজ করে ঠিক তেমন আমেরিকার গৃহযুদ্ধে হ্যারিয়েটের লেখা আঙ্কেল টমস কেবিন বইটি ছিলো সবচেয়ে বড় প্রভাবক। একবার চিন্তা করুন একটা বই পৃথিবীর ইতিহাস পাল্টে দিচ্ছে! ভাবলেই তো গায়ে কাঁটা দেয়।

১৮৫২ সালে আঙ্কেল টমস কেবিন প্রকাশিত হলে আমেরিকায় দাসপ্রথার পক্ষে বিপক্ষের লোকদের মাঝে শুরু হয়েছিল তুমুল বিদ্রোহ আর গৃহযুদ্ধ। আর এর যের ধরেই ১৮৬৫ সালে আমেরিকার সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে দাসপ্রথাকে নিষিদ্ধ ঘোষনা করতে বাধ্য হয় সরকার।

অবাক করার মতো বিষয়, তাই না? একটা বই এর ক্ষমতা কতখানি তা আমরা এই ইতিহাস থেকে বেশ বুঝতে পারি। দাসপ্রথার যে নির্মমতা এই বই এ বর্নিত হয়েছে, তা পড়ে বেশ উপলব্ধি করা যায় কতটা কঠিন আর অসহ্য ছিল দাসদের জীবন। ওদেরকে পশুর থেকেও অধম মনে করা হত, সারা দিন খাটুনি আর রাতের বেলায় চাবুক মেরে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলে রাখা হত। ক্রীতদাসদের যেন কোনো জীবন থাকতে নেই, প্রানহীন দেহ শুধু খেটে যাবে তাদের জন্য তাই ভাবা হত।

আঙ্কেল টমস কেবিন বইয়ের কারণে কি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনকে গুলে করে হত্যা করা হয়?

১৮৬০ সালে ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে আব্রাহাম লিংকনকে মুখোমুখি হতে হয় এমন এক সংকটের, যার সামনে পড়তে হয়নি তার আগে কোনো আমেরিকান প্রেসিডেন্টকে, গৃহযুদ্ধ। সেই সময়ে আমেরিকার রাজ্যগুলোর সাথে কেন্দ্রের বেশ কিছু ব্যাপার নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছিল। কিন্তু দাসপ্রথা নিয়ে উত্তরের রাজ্যগুলোর সাথে দক্ষিণের রাজ্যগুলোর বিভেদ ছিল দিন আর রাতের মতো পরিষ্কার।

কৃষ্ণাঙ্গদের দাস হিসেবে রাখা না রাখার কেন্দ্রীয় আইন কেন্দ্র ও উত্তরের রাজ্যগুলোর সাথে দক্ষিণের রাজ্যগুলোর বিবাদকেই গৃহযুদ্ধ শুরুর প্রধান কারণ হিসেবে বলে থাকেন অনেক ঐতিহাসিক। ১৮৫২ সালে প্রকাশিত ‘আংকেল টমস কেবিন’ যখন প্রকাশিত হয়, তখনও আমেরিকায় দাসপ্রথা বিরোধী মনোভাব ছিল খুবই কম। কিন্তু খুব দ্রুতই বইটি জনপ্রিয়তা পায় আর মানুষজন সচেতন হয়ে ওঠে দাসদের ব্যাপারে। কিন্তু আমেরিকার দক্ষিণের রাজ্যগুলো ছিল পুরো মাত্রায় দাসনির্ভর। ফলে দাসপ্রথা বিরোধী মনোভাব তাদের নাড়া দিতে পারেইনি, উল্টো পুরো দেশকে দুই ভাগে ভাগ করে দেয়। তবে কি এই একটি বই দায়ী ছিল চার বছরের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের জন্য? এর উত্তর পেতে হলে ফিরে যেতে হবে উপন্যাসের কাহিনীতে, সেই সাথে পেছনের ইতিহাসেও।

উনিশ শতকের সেরা উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃত বইটির লেখিকা ছিলেন হ্যারিয়েট বিচার স্টো। প্রথম বছরেই বইটির প্রায় তিন লক্ষাধিক কপি বিক্রি হয়। বিক্রির সংখ্যা দিয়ে একমাত্র বাইবেলই ছিল আংকেল টমস কেবিনের সামনে। উপন্যাসে আর্থার শেলবির ফার্মে ক্রীতদাস হিসেবে কাজ করতেন মধ্যবয়স্ক টম। আর্থার শেলবি তার দাসদের সাথে ভালো ব্যবহার করলেও অর্থের অভাবে সিদ্ধান্ত নেন দুজন দাসকে বিক্রি করে দেবার। সেই দুই দাস ছিলেন টম এবং আর্থারের স্ত্রীর দাস এলিজার ছেলে হ্যারি। তাদের বিক্রি করার টাকা দিয়ে দেনা শোধ করাসহ ফার্মকে লাভজনক করার পরিকল্পনা ছিল আর্থারের।

কিন্তু ঘটনাক্রমে এলিজা এই পরিকল্পনা জেনে যায় এবং তার ছেলে হ্যারিকে নিয়ে পালিয়ে যায় কানাডার উদ্দেশ্যে। আমেরিকায় সেসময় দাসপ্রথা চালু থাকলেও কানাডায় ছিল না। অন্যদিকে এলিজা টমকে পালানোর কথা বললেও তিনি রাজি হননি। ফলে টমকে বিক্রি হয়ে যেতে হয় ক্রীতদাস ব্যবসায়ীদের কাছে। আংকেল টমের পরবর্তী গন্তব্য হয় সেইন্ট ক্ল্যায়ার নামের এক মালিকের কাছে। সেইন্ট ক্ল্যায়ারও দাসদের প্রতি খারাপ ব্যবহার করতেন না, তবে তিনি কৃষ্ণাঙ্গদের নিচু জাত হিসেবেই দেখতেন। সেইন্ট ক্ল্যায়ারের ছোট্ট মেয়ে ইভার সাথে আংকেল টমের বেশ শখ্যতা গড়ে ওঠে। কিন্তু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে ইভা মারা যায়। তবে মারা যাবার আগে সে আংকেল টমকে এক অদ্ভুত স্বপ্নের কথা বলে যায়, যেখানে ছিল না কোনো ভেদাভেদ।

১৮৩০ এর দশকে দক্ষিণ ওহাইয়োতে বাস করতেন হ্যারিয়েট, সে সময় তিনি সাক্ষাৎ পান দাসত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া কিছু মানুষের। তাদের কাছ থেকে সরাসরি জানতে পারেন দাসত্ব জীবনের ভয়াবহতার কথা। হ্যারিয়েট সব সময়ই বলেছেন, কোনো নির্দিষ্ট দাসের জীবন নিয়ে তার উপন্যাসটি নয়। আংকেল টমস কেবিন প্রকাশের ঠিক পরের বছরই তিনি আরেকটি বই প্রকাশ করেন, ‘দ্য কি টু আংকেল টমস কেবিন’। এই বইয়ে তিনি প্রকাশ করেন সত্যিকারের দাসদের কষ্টের জীবনের কথা, দাসত্ব থেকে পালিয়ে যাবার কথা। তবে তিনি সাবধানতার কারণে পালিয়ে যাবার ব্যাপারে বিস্তারিত লেখেননি। এই বইটি আমেরিকার দাসপ্রথার অপরাধগুলোর একটি দলিল হিসেবে বলা যেতে পারে।

আংকেল টমস কেবিনের প্রভাব গৃহযুদ্ধের পেছনে যখন এত কারণ ছিল, তাহলে আংকেল টমস কেবিন ঠিক কীভাবে প্রভাবিত করলো গৃহযুদ্ধের সূচনাকে? উত্তরের জনগণ দাসপ্রথার ব্যাপারে খুব একটা চিন্তিত না হলে কৃষ্ণাঙ্গদের মানুষ হিসেবেই গণ্য করতো না বেশিরভাগ শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান। ফলে দক্ষিণের দাসদের ব্যাপারে তাদের না ছিল কোনো চিন্তা, না ছিল কোনো সহমর্মিতা। তারা নিজেদের জীবন নিয়েই ব্যস্ত ছিল, দাস কিংবা কৃষ্ণাঙ্গদের কষ্টের কথা ভাবার কোনো অবকাশ তাদের ছিল না।

কিন্তু ‘আংকেল টমস কেবিন’ প্রকাশিত হবার পর আর গল্প বলার ধরনের জনপ্রিয়তা সবাইকে নতুন করে ভাবিয়ে তোলে। সাধারণ জনগণ নিজেদের অবস্থান থেকে দাসদের অবস্থা বিবেচনা করার সুযোগ পায়। ফলে খুব দ্রুত দাসপ্রথা বিরোধী মনোভাব ছড়িয়ে পড়ে উত্তরের রাজ্যগুলোতে। অনেকটা স্কুলে থাকতে সমাজ বইয়ে মোঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস পড়া আর আলেক্স রাদারফোর্ডের ‘এম্প্যায়ার অব দ্য মোঘলস’ সিরিজ পড়ে মোঘল সাম্রাজ্য জানার মতো। উপন্যাস পড়ে খুব সহজেই নিজেদের গল্পের চরিত্রগুলোর সাথে মেলানো যায়। আর ঠিক এই জায়গাটিতেই প্রভাব রাখে এই উপন্যাসটি। সবাইকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে দাসত্ব নিয়ে, দাসদের কষ্ট নিয়ে।

উত্তরের জনগণ যেমন উপন্যাস যেমন উত্তরের জনগণকে সচেতন করে সাড়া ফেলে, দক্ষিণে ঘটে ঠিক উল্টো ঘটনা। ‘আংকেল টমস কেবিনকে’ প্রশ্নবিদ্ধ করাসহ দক্ষিণের সাহিত্যিকরা দাসপ্রথার পক্ষে লেখা শুরু করেন। দাসপ্রথা কেন দরকার, দাসপ্রথার উপকারী দিক এসব নিয়ে শুরু হয়ে লেখালেখি। আর এর ফলে গোলাবারুদের গৃহযুদ্ধ শুরু হবার আগেই সাহিত্যিকরা নিজেদের মধ্যে কলমের যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছিলেন, আর এর মূলে যে ছিল আংকেল টমস কেবিন তা তো সহজেই বোঝাই যায়। কিন্তু এই বিখ্যাত উপন্যাসটি সূচনা করে গৃহযুদ্ধের- এ কথাটি বলা কি আদৌ যৌক্তিক?

প্রশ্নগুলো সহজ, উত্তর গুলো জানা!
Previous Post Next Post